অায়নার সামনে দাঁড়াতেই অাবারো অামার সামনে সেই
বিশ্রী অবয়ব টা ভেসে উঠলো। অামি ভয়ে চিৎকার করে
উঠলাম। রাসফি দৌড়ে এসে অামার বাহু দু হাতে অাঁকড়ে
ধরে বললো
-তোমাকে না কতদিন বলেছি, যেহেতু অায়নার সামনে
দাঁড়ালে তোমার সমস্যা হয়, তাহলে অায়নার সামনে অার
দাঁড়াবে না। অামি কাঁদো কাঁদো গলায় বললাম
-কে যেন অামাকে জোর করে এনে অায়নার সামনে দাঁড়
করিয়ে দেয়। অামি শত চেষ্টা করেও অাটকাতে পারি
না। অায়নাটা অামাকে ভীষণভাবে টানে। রাসফি প্রচুর
রেগে গিয়ে ড্রেসিং টেবিলের
অায়নাটার গায়ে ফুলদানি দিয়ে সজোড়ে অাঘাত করে
ভেঙে ফেললো, সাথে সাথে ড্রেসিং টেবিল থেকে
লাল তরল পদার্থ বের হতে থাকলো। অামি ভয়ে চিৎকার
দিয়ে রাসফিকে জড়িয়ে ধরলাম। রাসফির চোখ-মুখ শক্ত
হয়ে গেছে ভয়ে। ড্রেসিং টেবিলের অায়না ভাঙলে
সেখান থেকে রক্ত বের হতে পারে, সেটা রাসফি কেন
অামরা কেউ কখনো কল্পনা করি নি! মুহুর্তে রক্তে
অামাদের পুরো রুমের মেঝে ভরে গেলো। অামরা
অাশ্চর্য হয়ে লক্ষ করলাম, রক্তটা নিজে নিজে এক একটা
অক্ষরে পরিণত হচ্ছে। প্রথমে 'ন' 'র' 'জ' হলো তারপর
সেগুলোতে ই-কার, অা-কার বসে একটা নাম হয়ে গেলো।
পরিপূর্ণ নাম। "নিরাজ"। কিন্তু অামি তো নিরাজের কোন
ক্ষতি করি নি। উল্টো নিরাজই অামার ক্ষতি করেছিলো।
অামাকে মিথ্যা কথা বলে একটা ভয়ঙ্কর ভূতুড়ে বাড়িতে
নিয়ে গিয়ে অামার জীবনটা বিপন্ন করে দিয়েছিলো।
ভাগ্য ভাল হওয়ায় অামি সেদিন সে বাড়ি থেকে ফিরে
অাসি। অামি অাজও জানি না, নিরাজ অাসলেই মানুষ
ছিল নাকি অন্যকিছু। সেই ঘটনার পর পরই অামরা পুরু
পরিবার সেই শহর ছেড়ে চলে অাসি। তবুও কেন নিরাজ
অামার পিছু ছাড়ছে না। অামি যখন একা থাকি তখন মনে
হয় কেউ অামার পাশে বসে অাছে। একা হাঁটলে মনে হয়
কেউ অামার পিছু পিছু হেঁটে অাসছে, অামাকে অনুসরণ
করছে। অামি প্রচন্ড ভয় পাই তখন। প্রচন্ড। অায়নার
সামনে দাঁড়ালেই একটা জঘন্য বিশ্রী মুখ দেখতে পাই
অামি। সেই ভয়ঙ্কর বিশ্রী মুখটি। এটি কি তাহলে
নিরাজ? নাহ, অামি অার পারছি না, অামি অাজ সবকিছু
বলে দেব রাসফিকে। কিছুই গোপন করবো না ওর কাছে
অার। তাতে করে অামার সংসার টিকুক অার না টিকুক।
এমন ভয়ঙ্কর জীবন অামি অার নিতে পারছি না। এখন
অামি ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। সব ঘটনা বলার জন্য রাসফি
কে নিয়ে নীরবে বসলাম অার বলতে থাকলাম অামার
জীবনের লোমহর্ষক এক দিনের কথা।
.
নিরাজ ছেলেটা একেবারেই অন্যরকম ছিল। মানুষ জনের
সাথে খুব কম মিশতো। ক্লাসে এসে সবার পেছনের সীটে
বসে থাকতো। কারও সাথে কথা বলতো না। ওর সাথেও
কেউ তেমন কথা বলতো না। ওকে ভীষণ একাকি মনে হয়
বলেই ওর প্রতি অামার কেমন যেন মায়ার জন্ম নিলো।
অামি অাস্তে অাস্তে ওর সাথে মিশতে শুরু করলাম।
একটা সময় বুঝতে পারলাম যে, নিরাজও অামার সাথে
মিশতে স্বাচ্ছ্যন্দ বোধ করছে। অচিরেই অামাদের বন্ধুত্ব
জমে গেলো। নিরাজ একদিন হঠাৎ করেই ওর বোন কে
পড়াবার প্রস্তাব দিয়ে বসলো। অামি কোনকিছু না
ভেবেই রাজি হয়ে গেলাম।নিরাজের দেয়া ঠিকানা
অনুযায়ী প্রথমদিন পড়াতে গিয়েই বিশাল অবাক হলাম।
রাজপ্রাসাদের মত বাড়ি নিরাজদের। বাড়ির প্রতিটি
দেয়াল যেন মণি মুক্তা খচিত। পুরু বাড়ি চকচক করছে।
অামি দরজায় কলিংবেল চাপতেই দরজা খোলে গেলো।
কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে যে, দরজায় অামি কাউকে
দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম না। দরজায় যখন কেউ নেই,
তাহলে দরজা খোলে দিলো কে! এই প্রশ্নটা অামার
মনকে উলট পালট করে দিলো। অামি কেমন যেন ভয়ে
ঘাবড়ে গেলাম। অামি ভেতরে ঢুকবো কি ঢুকবো না,
সেটা স্থির করার অাগেই একটা অলৌকিক শক্তি
সজোরে অামাকে ধাক্কা দিয়ে ভেতরের দিকে ঠেলে
দিলো। অামি বাইজিদের মত ভেতরের ফ্লোরে হুমড়ি
খেয়ে পড়লাম। অামি দরজার দিকে তাকাতে তাকাতেই
দরজা বিকট শব্দ করে বন্ধ হয়ে গেলো। অামার শিরদাঁড়া
বেয়ে তখন ভয়ের স্রোত দরদর করে নামছে। অামি চিৎকার
করতে চেয়েও পারলাম না। নিজেকে শক্ত করে অাস্তে
অাস্তে তোতলাতে তোতলাতে কয়েকবার ডাকলাম,
'নিনিনিরাজ'। নিরাজের কোন সাড়া শব্দ পেলাম না।
অামি অাস্তে করে উঠে দাঁড়ালাম। কি করবো বুঝতে
পারছিলাম না। পুরো বাড়ি জনমানবশূন্য মনে হচ্ছে। এত
বড় বাড়িতে কেউ নেই, সেটা বিশ্বাস করতে কষ্ট
হচ্ছিলো। বাড়ি তো বেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছ
ন্ন। বাড়িতে কেউ না থাকলে তো বাড়ি এত সতেজ
থাকার কথা না। অামি যেহেতু এই বাড়িতে বন্দি হয়ে
গেছি, তাই নিজের মনকে নিজে শান্ত্বনা দিয়ে কিছুটা
সাহস যুগিয়ে ডুপ্লেক্স বাড়িটার সিঁড়ি বেয়ে উপরের
তলায় উঠতে থাকলাম। অর্ধেক সিঁড়ি পর্যন্ত উঠতেই
বিদ্যুৎ চলে গেলো। সবকিছু অন্ধকার হয়ে গেলো। এ
অন্ধকারকে স্বাভাবিক অন্ধকারের চেয়ে গাঢ় মনে হলো
অামার অাছে। নিকষ কালো অন্ধকারের চেয়ে বেশী
কিছু যেন! অামি অামার হাতে থাকা মোবাইলের
ফ্ল্যাশলাইট জ্বালালাম। ফ্ল্যাশ জালাতেই দেখি
অামার সামনের সিঁড়িতে কালো গাউন পড়া একজন শুয়ে
অাছে। একটু অাগেও তো সিঁড়িতে কেউ ছিলো না,
তাহলে এখন হুট করেই এই লোকটা কোথা থেকে অাসলো?
অামি ভয়ে জড়সড় হয়ে গেলাম। মূল দরজা যে বন্ধ অাছে
সেটা বেমালুম ভুলে গেলাম। দরজার দিকে সজোড়ে
দৌড় দিলাম; কিন্তু পেছন থেকে একটা শক্ত হাত অামার
পা অাঁকড়ে ধরলো। অামি হুচট খেয়ে পড়ে গেলাম। এবার
অামি গায়ে চিৎকার করার শক্তি অনুভব করলাম অার
গলা ফাঁটিয়ে চিৎকার করে উঠলাম। পেছনে তাকিয়ে
দেখি সিঁড়িতে শুয়ে থাকা লোকটার একটা হাত অামার
পা টা ধরে অাছে।
অামি গায়ের জোড়ে লোকটির হাত অামার পা থেকে
ছাড়িয়ে নিতে চাইলাম। কিন্তু না, অামি পারলাম না।
লোকটিকে দেখে মৃত বলে মনে হচ্ছে, তাহলে সে কি
করে অামার পা অাঁকড়ে ধরে রাখতে পারে? ভয়ে অামার
কলিজা কেঁপে উঠলো। ভয়ে দরদর করে ঘামছি অামি।
নিরাজ কে চিৎকার করে ডাকছি কিন্তু অামার গলার স্বর
প্রতিধ্বনিত হয়ে অাবার অামার কানে ফিরে এলো।
কোথাও কারও কোন সাড়া পেলাম না। হঠাৎই অামি
অনুভব করলাম, সিঁড়িতে পড়ে যাওয়ার দরুণ অামার ঠোঁট
কেটে রক্ত বের হচ্ছে। অামি হাত দিয়ে ঠোঁটের রক্ত মুছে
নিলাম। তারপর অবারও অামার পা থেকে ঐ ব্যক্তির হাত
ছাড়াতে চেষ্টা করলাম। অামি অবাক হয়ে লক্ষ করলাম
অামার হাতে লেগে থাকা রক্ত ঐ লোকটার হাতে
লাগার সাথে সাথে পুরো বাড়ি কাঁপতে শুরু করলো।
বিদ্যুৎ অাসছে যাচ্ছে। ঘরের লাইটগুলো একনাগাড়ে
জ্বলছে অার নিভছে। পুরো বাড়ি থর থর করে কাঁপছে।
বাড়ির সব জিনিসপত্র উলট পালট হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে
যাচ্ছে। সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার হচ্ছে, হঠাৎ করেই
বাড়ির ভেতর যেন কালবৈশাখী ঝড় শুরু হয়ে গেছে।
প্রচন্ড দমকা বাতাস। কোন বাড়ির ভেতর এমন দমকা
বাতাস বইতে পারে তা অামার জানা ছিলো না। অামি
অামার ভয়ের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছুলাম যখন পুরুপুরি
বিদ্যুৎ চলে এলো। সিঁড়িতে শুয়ে থাকা লোকটি দাঁড়িয়ে
অাছে। তার পড়নে কালো গাউন, মাথার চুল ফ্লোর অব্দি
লম্বা, তার হাতগুলোও প্রায় ফ্লোর ছুঁই ছুঁই। নখগুলো প্রায়
এক ফুট অব্দি লম্বা। লোকটার চোখ নেই। চোখের জায়গা
দুটোতে দুটো অাগুনের বলের ন্যায় কিছু বসানো।
লোকটির দাঁতের রং লাল। একেবারে রক্তের মত লাল।
দাঁতগুলো অাধা হাত লম্বা লম্বা, মুখের গড়ন কেমন
বিশ্রী। লোকটা একটু অাগে শুয়ে থাকার সময়ও তাকে
এতটা ভয়ংকর লাগছিলো না, যতটা এখন লাগছে। অামার
পুরু শরীর ঘেমে ভিজে গেছে। ভয়ে অামার চোখ-মুখ লাল
হয়ে গেছে। অামি যেন নিঃশ্বাস নিতে পারছি না।বুকের
ধুকপুকানি ক্রমশ বাড়ছে অার বাড়ছে। লোকটি হা হা
করে হাসছে। এটা কি নিরাজ? হয়তবা। নিরাজ না হলে ওর
বাড়িতে অার কে বা থাকবে? লোকটির রক্তাক্ত দাঁতের
বিশ্রী হাসির চেয়ে ভয়ংর দৃশ্য অার কিছু অাছে বলে
অামার মনে হচ্ছে না। লোকটি ধীর পায়ে অামার দিকে
এগিয়ে অাসছে। অামার কাছে মনে হচ্ছে, অামি একটু
একটু করে মারা যাচ্ছি। অামি গুটি গুটি পায়ে কাঁদতে
কাঁদতে পিছিয়ে যাচ্ছি। অামি যতই পিছিয়ে যাচ্ছি
লোকটি ততই তার হাসির মাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে। অামি
পিছাতে পিছাতে এসে দরজায় ঠেকে গেলাম। লোকটি
এক পাও নড়লো না। অামার চোখের সামনে তার হাত
লম্বা হতেই থাকলো এবং হতেই থাকলো। একসময়
লোকটির হাত এসে অামার ডান বাহুতে চেপে বসলো।
তারপর অামার অার কিছু মনে নেই। অজ্ঞান হয়ে গেলাম।
দুই দিন পর অামার জ্ঞান ফিরলো। দেখলাম অামি
হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে। মা বললো, অামাকে নাকি
অামাদের বাসার ছাদে পাওয়া গেছে অজ্ঞান অবস্থায়।
অামি কাউকে সেই বিভৎস ঘটনার কথা বললাম না। কেবল
বাবাকে বললাম, ঐ শহর ছেড়ে চলে যেতে। বাবা অামার
সাথে কথা প্যাঁচালো না। অামার কথা রাখলো। কিন্তু
নিরাজ অামার পিছু ছাড়ে নি। অামাকে সব সময় ভয়
দেখাতো। মাঝে মাঝে স্বপ্নে অাগের শহরে ফিরে
যেতে বলতো। অামি চিৎকার করে উঠতাম ঘুম থেকে।
অামার এই অবস্থা দেখে বাবা অামাকে তোমার সাথে
বিয়ে দেয়; কিন্তু তবুও সমস্যা থেকেই যায়।
.
অামার সব কথা শুনে রাসফি অামাকে এক সাধু বাবার
কাছে নিয়ে যায়। সাধু বাবা তাবিজ দেয়ায় অামার
কাছে নিরাজ অার ঘেঁষতে পারে না। কিন্তু অামার
জীবনে অাবার ভয় নেমে এলো অামার ছেলের জন্মের
দিন। অামার ছেলেকে সবাই মেরে ফেলতে চাইছে।
অামাকে ছেলের চেহারা পর্যন্ত দেখতে দিচ্ছে না
ডাক্তাররা। অামার ছেলের হাত, পা, নখ, দাঁত সবকিছুই
নাকি অস্বাভাবিক লম্বা অার ছেলের দাঁতের রঙ ও
নাকি লাল, চোখ নাকি অাগুনের অবয়ব। অামি রাসফিকে
ডেকে হাউমাউ ককরে কঁদতে কাঁদতে বললাম
-এ কি হলো গো অামাদের জীবনে? অামাদের ছেলেটা
এমন কেন হল গো?
রাসফি অামার হাত চেঁপে ধরে বললো
-ছেলে বাবার মত হবে না তো কার মত হবে?
রাসফির কথা শুনে অাঁৎকে উঠলাম অামি। কি বলছে ও
এসব!
সাথে সাথে দেখলাম, অামার চোখের সামনে রাসফির
চেহারা পাল্টে যাচ্ছে। ওর দাঁত লম্বা হয়ে রক্তবর্ণ ধারণ
করছে। হাত পা চুল সব লম্বা হয়ে যাচ্ছে। ওর চোখ দুটো
অাগুনের বলের মত হয়ে যাচ্ছে। অামার কৌতূহলী চোখ
দুটো বড় বড় হয়ে রাসফির পরিবর্তন হওয়া চেহারার দিকে
তাকিয়ে অাছে। এই বিশ্রী অবয়ব কী অামার পিছু ছাড়বে
না কখনো?এ অামি কাকে দেখছি? কে এটা? এটি রাসফি
নাকি নিরাজ? নিরাজ নাকি রাসফি? না, অামি অার
কিচ্ছু ভাবতে পারছি না, কিচ্ছু না।
বিশ্রী অবয়ব টা ভেসে উঠলো। অামি ভয়ে চিৎকার করে
উঠলাম। রাসফি দৌড়ে এসে অামার বাহু দু হাতে অাঁকড়ে
ধরে বললো
-তোমাকে না কতদিন বলেছি, যেহেতু অায়নার সামনে
দাঁড়ালে তোমার সমস্যা হয়, তাহলে অায়নার সামনে অার
দাঁড়াবে না। অামি কাঁদো কাঁদো গলায় বললাম
-কে যেন অামাকে জোর করে এনে অায়নার সামনে দাঁড়
করিয়ে দেয়। অামি শত চেষ্টা করেও অাটকাতে পারি
না। অায়নাটা অামাকে ভীষণভাবে টানে। রাসফি প্রচুর
রেগে গিয়ে ড্রেসিং টেবিলের
অায়নাটার গায়ে ফুলদানি দিয়ে সজোড়ে অাঘাত করে
ভেঙে ফেললো, সাথে সাথে ড্রেসিং টেবিল থেকে
লাল তরল পদার্থ বের হতে থাকলো। অামি ভয়ে চিৎকার
দিয়ে রাসফিকে জড়িয়ে ধরলাম। রাসফির চোখ-মুখ শক্ত
হয়ে গেছে ভয়ে। ড্রেসিং টেবিলের অায়না ভাঙলে
সেখান থেকে রক্ত বের হতে পারে, সেটা রাসফি কেন
অামরা কেউ কখনো কল্পনা করি নি! মুহুর্তে রক্তে
অামাদের পুরো রুমের মেঝে ভরে গেলো। অামরা
অাশ্চর্য হয়ে লক্ষ করলাম, রক্তটা নিজে নিজে এক একটা
অক্ষরে পরিণত হচ্ছে। প্রথমে 'ন' 'র' 'জ' হলো তারপর
সেগুলোতে ই-কার, অা-কার বসে একটা নাম হয়ে গেলো।
পরিপূর্ণ নাম। "নিরাজ"। কিন্তু অামি তো নিরাজের কোন
ক্ষতি করি নি। উল্টো নিরাজই অামার ক্ষতি করেছিলো।
অামাকে মিথ্যা কথা বলে একটা ভয়ঙ্কর ভূতুড়ে বাড়িতে
নিয়ে গিয়ে অামার জীবনটা বিপন্ন করে দিয়েছিলো।
ভাগ্য ভাল হওয়ায় অামি সেদিন সে বাড়ি থেকে ফিরে
অাসি। অামি অাজও জানি না, নিরাজ অাসলেই মানুষ
ছিল নাকি অন্যকিছু। সেই ঘটনার পর পরই অামরা পুরু
পরিবার সেই শহর ছেড়ে চলে অাসি। তবুও কেন নিরাজ
অামার পিছু ছাড়ছে না। অামি যখন একা থাকি তখন মনে
হয় কেউ অামার পাশে বসে অাছে। একা হাঁটলে মনে হয়
কেউ অামার পিছু পিছু হেঁটে অাসছে, অামাকে অনুসরণ
করছে। অামি প্রচন্ড ভয় পাই তখন। প্রচন্ড। অায়নার
সামনে দাঁড়ালেই একটা জঘন্য বিশ্রী মুখ দেখতে পাই
অামি। সেই ভয়ঙ্কর বিশ্রী মুখটি। এটি কি তাহলে
নিরাজ? নাহ, অামি অার পারছি না, অামি অাজ সবকিছু
বলে দেব রাসফিকে। কিছুই গোপন করবো না ওর কাছে
অার। তাতে করে অামার সংসার টিকুক অার না টিকুক।
এমন ভয়ঙ্কর জীবন অামি অার নিতে পারছি না। এখন
অামি ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। সব ঘটনা বলার জন্য রাসফি
কে নিয়ে নীরবে বসলাম অার বলতে থাকলাম অামার
জীবনের লোমহর্ষক এক দিনের কথা।
.
নিরাজ ছেলেটা একেবারেই অন্যরকম ছিল। মানুষ জনের
সাথে খুব কম মিশতো। ক্লাসে এসে সবার পেছনের সীটে
বসে থাকতো। কারও সাথে কথা বলতো না। ওর সাথেও
কেউ তেমন কথা বলতো না। ওকে ভীষণ একাকি মনে হয়
বলেই ওর প্রতি অামার কেমন যেন মায়ার জন্ম নিলো।
অামি অাস্তে অাস্তে ওর সাথে মিশতে শুরু করলাম।
একটা সময় বুঝতে পারলাম যে, নিরাজও অামার সাথে
মিশতে স্বাচ্ছ্যন্দ বোধ করছে। অচিরেই অামাদের বন্ধুত্ব
জমে গেলো। নিরাজ একদিন হঠাৎ করেই ওর বোন কে
পড়াবার প্রস্তাব দিয়ে বসলো। অামি কোনকিছু না
ভেবেই রাজি হয়ে গেলাম।নিরাজের দেয়া ঠিকানা
অনুযায়ী প্রথমদিন পড়াতে গিয়েই বিশাল অবাক হলাম।
রাজপ্রাসাদের মত বাড়ি নিরাজদের। বাড়ির প্রতিটি
দেয়াল যেন মণি মুক্তা খচিত। পুরু বাড়ি চকচক করছে।
অামি দরজায় কলিংবেল চাপতেই দরজা খোলে গেলো।
কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে যে, দরজায় অামি কাউকে
দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম না। দরজায় যখন কেউ নেই,
তাহলে দরজা খোলে দিলো কে! এই প্রশ্নটা অামার
মনকে উলট পালট করে দিলো। অামি কেমন যেন ভয়ে
ঘাবড়ে গেলাম। অামি ভেতরে ঢুকবো কি ঢুকবো না,
সেটা স্থির করার অাগেই একটা অলৌকিক শক্তি
সজোরে অামাকে ধাক্কা দিয়ে ভেতরের দিকে ঠেলে
দিলো। অামি বাইজিদের মত ভেতরের ফ্লোরে হুমড়ি
খেয়ে পড়লাম। অামি দরজার দিকে তাকাতে তাকাতেই
দরজা বিকট শব্দ করে বন্ধ হয়ে গেলো। অামার শিরদাঁড়া
বেয়ে তখন ভয়ের স্রোত দরদর করে নামছে। অামি চিৎকার
করতে চেয়েও পারলাম না। নিজেকে শক্ত করে অাস্তে
অাস্তে তোতলাতে তোতলাতে কয়েকবার ডাকলাম,
'নিনিনিরাজ'। নিরাজের কোন সাড়া শব্দ পেলাম না।
অামি অাস্তে করে উঠে দাঁড়ালাম। কি করবো বুঝতে
পারছিলাম না। পুরো বাড়ি জনমানবশূন্য মনে হচ্ছে। এত
বড় বাড়িতে কেউ নেই, সেটা বিশ্বাস করতে কষ্ট
হচ্ছিলো। বাড়ি তো বেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছ
ন্ন। বাড়িতে কেউ না থাকলে তো বাড়ি এত সতেজ
থাকার কথা না। অামি যেহেতু এই বাড়িতে বন্দি হয়ে
গেছি, তাই নিজের মনকে নিজে শান্ত্বনা দিয়ে কিছুটা
সাহস যুগিয়ে ডুপ্লেক্স বাড়িটার সিঁড়ি বেয়ে উপরের
তলায় উঠতে থাকলাম। অর্ধেক সিঁড়ি পর্যন্ত উঠতেই
বিদ্যুৎ চলে গেলো। সবকিছু অন্ধকার হয়ে গেলো। এ
অন্ধকারকে স্বাভাবিক অন্ধকারের চেয়ে গাঢ় মনে হলো
অামার অাছে। নিকষ কালো অন্ধকারের চেয়ে বেশী
কিছু যেন! অামি অামার হাতে থাকা মোবাইলের
ফ্ল্যাশলাইট জ্বালালাম। ফ্ল্যাশ জালাতেই দেখি
অামার সামনের সিঁড়িতে কালো গাউন পড়া একজন শুয়ে
অাছে। একটু অাগেও তো সিঁড়িতে কেউ ছিলো না,
তাহলে এখন হুট করেই এই লোকটা কোথা থেকে অাসলো?
অামি ভয়ে জড়সড় হয়ে গেলাম। মূল দরজা যে বন্ধ অাছে
সেটা বেমালুম ভুলে গেলাম। দরজার দিকে সজোড়ে
দৌড় দিলাম; কিন্তু পেছন থেকে একটা শক্ত হাত অামার
পা অাঁকড়ে ধরলো। অামি হুচট খেয়ে পড়ে গেলাম। এবার
অামি গায়ে চিৎকার করার শক্তি অনুভব করলাম অার
গলা ফাঁটিয়ে চিৎকার করে উঠলাম। পেছনে তাকিয়ে
দেখি সিঁড়িতে শুয়ে থাকা লোকটার একটা হাত অামার
পা টা ধরে অাছে।
অামি গায়ের জোড়ে লোকটির হাত অামার পা থেকে
ছাড়িয়ে নিতে চাইলাম। কিন্তু না, অামি পারলাম না।
লোকটিকে দেখে মৃত বলে মনে হচ্ছে, তাহলে সে কি
করে অামার পা অাঁকড়ে ধরে রাখতে পারে? ভয়ে অামার
কলিজা কেঁপে উঠলো। ভয়ে দরদর করে ঘামছি অামি।
নিরাজ কে চিৎকার করে ডাকছি কিন্তু অামার গলার স্বর
প্রতিধ্বনিত হয়ে অাবার অামার কানে ফিরে এলো।
কোথাও কারও কোন সাড়া পেলাম না। হঠাৎই অামি
অনুভব করলাম, সিঁড়িতে পড়ে যাওয়ার দরুণ অামার ঠোঁট
কেটে রক্ত বের হচ্ছে। অামি হাত দিয়ে ঠোঁটের রক্ত মুছে
নিলাম। তারপর অবারও অামার পা থেকে ঐ ব্যক্তির হাত
ছাড়াতে চেষ্টা করলাম। অামি অবাক হয়ে লক্ষ করলাম
অামার হাতে লেগে থাকা রক্ত ঐ লোকটার হাতে
লাগার সাথে সাথে পুরো বাড়ি কাঁপতে শুরু করলো।
বিদ্যুৎ অাসছে যাচ্ছে। ঘরের লাইটগুলো একনাগাড়ে
জ্বলছে অার নিভছে। পুরো বাড়ি থর থর করে কাঁপছে।
বাড়ির সব জিনিসপত্র উলট পালট হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে
যাচ্ছে। সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার হচ্ছে, হঠাৎ করেই
বাড়ির ভেতর যেন কালবৈশাখী ঝড় শুরু হয়ে গেছে।
প্রচন্ড দমকা বাতাস। কোন বাড়ির ভেতর এমন দমকা
বাতাস বইতে পারে তা অামার জানা ছিলো না। অামি
অামার ভয়ের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছুলাম যখন পুরুপুরি
বিদ্যুৎ চলে এলো। সিঁড়িতে শুয়ে থাকা লোকটি দাঁড়িয়ে
অাছে। তার পড়নে কালো গাউন, মাথার চুল ফ্লোর অব্দি
লম্বা, তার হাতগুলোও প্রায় ফ্লোর ছুঁই ছুঁই। নখগুলো প্রায়
এক ফুট অব্দি লম্বা। লোকটার চোখ নেই। চোখের জায়গা
দুটোতে দুটো অাগুনের বলের ন্যায় কিছু বসানো।
লোকটির দাঁতের রং লাল। একেবারে রক্তের মত লাল।
দাঁতগুলো অাধা হাত লম্বা লম্বা, মুখের গড়ন কেমন
বিশ্রী। লোকটা একটু অাগে শুয়ে থাকার সময়ও তাকে
এতটা ভয়ংকর লাগছিলো না, যতটা এখন লাগছে। অামার
পুরু শরীর ঘেমে ভিজে গেছে। ভয়ে অামার চোখ-মুখ লাল
হয়ে গেছে। অামি যেন নিঃশ্বাস নিতে পারছি না।বুকের
ধুকপুকানি ক্রমশ বাড়ছে অার বাড়ছে। লোকটি হা হা
করে হাসছে। এটা কি নিরাজ? হয়তবা। নিরাজ না হলে ওর
বাড়িতে অার কে বা থাকবে? লোকটির রক্তাক্ত দাঁতের
বিশ্রী হাসির চেয়ে ভয়ংর দৃশ্য অার কিছু অাছে বলে
অামার মনে হচ্ছে না। লোকটি ধীর পায়ে অামার দিকে
এগিয়ে অাসছে। অামার কাছে মনে হচ্ছে, অামি একটু
একটু করে মারা যাচ্ছি। অামি গুটি গুটি পায়ে কাঁদতে
কাঁদতে পিছিয়ে যাচ্ছি। অামি যতই পিছিয়ে যাচ্ছি
লোকটি ততই তার হাসির মাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে। অামি
পিছাতে পিছাতে এসে দরজায় ঠেকে গেলাম। লোকটি
এক পাও নড়লো না। অামার চোখের সামনে তার হাত
লম্বা হতেই থাকলো এবং হতেই থাকলো। একসময়
লোকটির হাত এসে অামার ডান বাহুতে চেপে বসলো।
তারপর অামার অার কিছু মনে নেই। অজ্ঞান হয়ে গেলাম।
দুই দিন পর অামার জ্ঞান ফিরলো। দেখলাম অামি
হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে। মা বললো, অামাকে নাকি
অামাদের বাসার ছাদে পাওয়া গেছে অজ্ঞান অবস্থায়।
অামি কাউকে সেই বিভৎস ঘটনার কথা বললাম না। কেবল
বাবাকে বললাম, ঐ শহর ছেড়ে চলে যেতে। বাবা অামার
সাথে কথা প্যাঁচালো না। অামার কথা রাখলো। কিন্তু
নিরাজ অামার পিছু ছাড়ে নি। অামাকে সব সময় ভয়
দেখাতো। মাঝে মাঝে স্বপ্নে অাগের শহরে ফিরে
যেতে বলতো। অামি চিৎকার করে উঠতাম ঘুম থেকে।
অামার এই অবস্থা দেখে বাবা অামাকে তোমার সাথে
বিয়ে দেয়; কিন্তু তবুও সমস্যা থেকেই যায়।
.
অামার সব কথা শুনে রাসফি অামাকে এক সাধু বাবার
কাছে নিয়ে যায়। সাধু বাবা তাবিজ দেয়ায় অামার
কাছে নিরাজ অার ঘেঁষতে পারে না। কিন্তু অামার
জীবনে অাবার ভয় নেমে এলো অামার ছেলের জন্মের
দিন। অামার ছেলেকে সবাই মেরে ফেলতে চাইছে।
অামাকে ছেলের চেহারা পর্যন্ত দেখতে দিচ্ছে না
ডাক্তাররা। অামার ছেলের হাত, পা, নখ, দাঁত সবকিছুই
নাকি অস্বাভাবিক লম্বা অার ছেলের দাঁতের রঙ ও
নাকি লাল, চোখ নাকি অাগুনের অবয়ব। অামি রাসফিকে
ডেকে হাউমাউ ককরে কঁদতে কাঁদতে বললাম
-এ কি হলো গো অামাদের জীবনে? অামাদের ছেলেটা
এমন কেন হল গো?
রাসফি অামার হাত চেঁপে ধরে বললো
-ছেলে বাবার মত হবে না তো কার মত হবে?
রাসফির কথা শুনে অাঁৎকে উঠলাম অামি। কি বলছে ও
এসব!
সাথে সাথে দেখলাম, অামার চোখের সামনে রাসফির
চেহারা পাল্টে যাচ্ছে। ওর দাঁত লম্বা হয়ে রক্তবর্ণ ধারণ
করছে। হাত পা চুল সব লম্বা হয়ে যাচ্ছে। ওর চোখ দুটো
অাগুনের বলের মত হয়ে যাচ্ছে। অামার কৌতূহলী চোখ
দুটো বড় বড় হয়ে রাসফির পরিবর্তন হওয়া চেহারার দিকে
তাকিয়ে অাছে। এই বিশ্রী অবয়ব কী অামার পিছু ছাড়বে
না কখনো?এ অামি কাকে দেখছি? কে এটা? এটি রাসফি
নাকি নিরাজ? নিরাজ নাকি রাসফি? না, অামি অার
কিচ্ছু ভাবতে পারছি না, কিচ্ছু না।
Comments
Post a Comment